১। সর্বশক্তিমান এবং মহাবিজ্ঞ আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীর পূর্ব,বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমস্ত ভাষাগুলো থেকে আরবিকে একচ্ছত্রভাবে বেছে নিয়েছেন সৃষ্টিজগতের কাছে তার বাণী পৌছানোর মাধ্যম হিসেবে। এই একটি সত্যই মুসলিমদের আরবি শেখার কারণ হিসেবে যথেষ্ট। আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে তিনি অবশ্যই অন্য কোনো একটি  ভাষায়ই শুধু নয় বরং অন্য সমস্ত ভাষাতেই কুরআন নাযিল করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের পবিত্র কুরআনে বলেন,”নিশ্চই আমি একে আরবি ভাষায় নাযিল করেছি যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।“ এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে আরবির কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। আর আল্লাহ তা’আলার সূক্ষ রহস্যগুলো এমনভাবে প্রচার করে যা অন্যান্য ভাষার দ্বারা সম্ভব নয়। উপরন্তু আল্লাহ নিজেই আরবিকে এসব অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং অন্যান্য ভাষার উপরে একে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।

২। আল্লাহ তা’আলা হচ্ছেন সমস্ত সৃষ্টিজগতের সৃষ্টিকর্তা। আর মুহাম্মাদ (সাঃ) হলেন আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি। তাহলে প্রতিটি মুসলিমেরই কি উচিত নয় আরবি ভাষা শিক্ষা করা যেন সে আল্লাহ এবং তার রাসূলের বাণী উপলব্ধি করতে পারে? এই কুরআন যদিও এই পৃথিবীতে বিদ্যমান, কিন্তু এর উৎপত্তি এই পৃথিবীতে হয়নি। বরং এটি সমস্ত সৃষ্টিজগতের রব আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। মহান আল্লাহ নিজেই বলেন, “নিশ্চই এটি(আল-কুরআন) সেই সত্ত্বার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ যিনি মহা জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ।“ তাহলে এটি কিভাবে হতে পারে যে একজন মুসলিম এই দুনিয়াতে অনেককিছু করার সময় পায় অথচ সে আল্লাহর পবিত্র কিতাব এবং তার রাসূলের(সাঃ) সুন্নাহ যেই ভাষায় এসেছে তা শেখার সময় পায়না? আমাদের মধ্যে অনেকেই সময়, শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করে দুনিয়াবি অনেক বিষয়াদি শেখে। অথচ সেই তুলনায় আখিরাতের বিষয়গুলো শেখার জন্য কোনো সময়ই ব্যয় করেনা। আমরা যদি সত্যকার অর্থেই আল্লাহ এবং তার রাসূলের(সাঃ) পরিচয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হই তবে আমাদের এক সেকেন্ডও দেরি করা উচিত নয় আল্লাহর কিতাব এবং তার রাসূলের(সাঃ) এর সুন্নাহর ভাষা শেখায় মনোনিবাস করায়। কুরআন এবং সুন্নাহ কতো মূল্যবান সম্পদে পরিপূর্ন। অথচ আমাদের অধিকাংশই দরিদ্র এবং বঞ্চিত থাকাকেই বেছে নেয়।

৩। কুরআন অন্যান্য সমস্ত বস্তু থেকে অনন্য এবং শ্রেষ্ঠ। অনেক আলেমই এর কারণ হিসেবে এর ভাষাকেই গণ্য করতেন। এমনকি আরবি অলঙ্কারশাস্ত্র গড়েই উঠেছে কুরআনের বিশেষ বিশেষ দিকগুলো আলোচনার উদ্দেশ্যে। এই শাস্ত্র নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে যে কুরআন বাগ্মীতা ও অলঙ্কারবিদ্যার সর্বোচ্চ চূড়ার প্রতিচ্ছবি বহন করে। এটি রচনাশৈলীর দিক থেকে অতুলনীয় এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে কুরআনের এই রচনাশৈলীর সমাদর করার জন্য আগে থেকেই জানা দরকার আরবি ভাষার জ্ঞান। তাই যারা আরবি ভাষা শেখেনি তারা চিরকাল কুরআনের রচনাশৈলী ও সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হবে।

৪। আরবি ভাষায় বর্ণিত কুরআন এবং সুন্নাহ বাদেও ইসলামের অনেক সমৃদ্ধ সম্পদ রয়েছে। এই সম্পদ্গুলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলো থেকে এসেছে। আরবি ভাষা না জানার কারণে আমরা নিজেদেরকে ১৪০০ বছরের ইসলামি জ্ঞান-গরিমা থেকে বঞ্চিত করছি। এই জ্ঞানের সমটুকুই ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর উপকারে এসেছে। ইসলামি মূলনীতিগুলো রক্ষা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে বহু জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা গড়ে উঠেছে। আর তা হয়েছে ইসলামের প্রচার প্রসারের পরপরই। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখাগুলো আজও পৃথিবীর বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠানে এবং মজলিসে পড়ানো হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে ইসলামের ঐতিহ্য আরো প্রচার-প্রসার হচ্ছে। পূর্ববর্তী আলেমদের অবদান না থাকলে আমরা ইসলামকে এখন যেভাবে পেয়েছি সেভাবে পেতাম না। আল্লাহ যেন তাদেরকে অগণিত পুরস্কার দান করেন, ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাদের অবদানের প্রতিদানস্বরূপ।

৫। ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কিছু শাখা সুনির্দিষ্টভাবে আরবি ভাষাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু বিষয় ভাষাগত। এই বিষয়গুলো বুঝতে হলে আরবি ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে বিষদ জ্ঞান থাকতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই শাখাগুলোর মধ্যে রয়েছে তাফসিরশাস্ত্র, হাদিসশাস্ত্র, ফিকহশাস্ত্র,আকিদাশাস্ত্র। এর কারণ হলো ইসলামের প্রধান দুটি উৎস হলো কুরআন এবং সুন্নাহ এবং উভয়ের ভাষা আরবি। তাই এদের বাণীকে উদঘাটন করতে হলে, বিশেষভাবে কুরআনের সূক্ষ ভাষাগত অলঙ্কারের মর্ম বুঝতে হলে একজনকে অবশ্যই আরবি ভাষার জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে যা এই কাজকে সম্ভবপর করবে। কারণ তাফসির কুরআনের ব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। হাদিসশাস্ত্র বস্তুত রাসুল(সাঃ) এর হাদিসের ব্যাখা-বিশ্লেষণ। ফিকহশাস্ত্র তেমনিভাবে কুরআন এবং সুন্নাহে বর্ণিত বিভিন্ন বিধি-বিধান ও আইন কানুনের বর্ণনা। আকিদাহ হলো কুরআন এবং সুন্নাহে বর্ণিত বিশ্বাসমালার সমষ্টি। উপরের উল্লিখিত উদাহরণগুলো থেকে সুস্পষ্ট যে এই প্রতিটি শাখা-প্রশাখা কুরআনের ভাষারই বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এবং ইসলামের বিভিন্ন শাখার আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য পাওয়াও বিরল ঘটনা নয়। কারণ একেকজন একেকভাবে একটি আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন তিনি নিজে যেভাবে আয়াতটির অর্থ ও ব্যাখা বুঝেছেন সেভাবে।

৬। উমার(রাঃ) বলেন, “সুন্নাহ এবং আরবি ভাষা শিখো। কুরআন আরবি ভাষাতেই শিখো কারণ এর ভাষা আরবি।”

তিনি আরো বলেন, “আরবি শিখো কারণ এটি তোমাদের দ্বীনের অংশ। এবং শিখে নাও কিভাবে বিগত লোকদের সম্পদ(ফরয কাজগুলো) বন্টন করতে হয়। কারণ এগুলো তোমাদের দ্বীনের অংশ।”

ইমাম শাফেয়ি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে তিনি ২০ বছর যাবত আরবি ভাষা শিখেন(সবচেয়ে বিশুদ্ধ উৎসগুলো থেকে) যাতে তিনি কুরআন বুঝতে পারেন।

কিছু কিছু আলেম উল্লেখ করেন যে আরবি ভাষা শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। এই বিধানের কারণ হলো কুরআন এবং সুন্নাহর জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। আর যেহেতু আরবি ছাড়া সেই জ্ঞানার্জন সম্ভব নয় সেহেতু আরবি শিখাও বাধ্যতামূলক।

আল আইমুই বলেনঃ

IIRT Arabic Intensive - একটি দুই বছর মেয়াদী অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা প্রোগ্রাম।

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

“ইলমের ছাত্রদের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে ভয় করি যেই বিষয়ে তা হলো তারা সেই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে না জেনে হাদিসে উল্লিখিত সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে যাদের সম্পর্কে রাসূল(সাঃ) বলেন, “যে কেউ আমার সম্পর্কে মিথ্যা কথা ছড়ায় সে যে তার স্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।“ যেহেতু আল্লাহর রাসূল(সাঃ) ব্যাকরণগত ভুল করতেন না সেহেতু তুমি তার কাছ থেকে যা কিছু বর্ণনা করবে তাতে যদি ব্যাকরণগত ভুল থাকে তাহলে তুমি তার নামে মিথ্যারোপ করলে।“

৭। আরবি ভাষার জ্ঞান একজন ব্যক্তির নিষ্ঠা এবং ইবাদতকে অনেক বেশি অর্থবহুল করে তোলে  বিশেষভাবে সালাত আদায়ের সময়, কুরআন তিলাওয়াত বা শোনার সময়, খুতবা শোনার সময়, দুআ করার সময়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে। সংক্ষেপে বলা যায় যে আরবি ভাষা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং আমাদের মাঝে কোনো আয়োজক বা তরজমাকারীর প্রয়োজনকে নাকোচ করে দেয়। অন্যভাবে বলা যায় আরবি ভাষার জ্ঞান আমাদেরকে সরসরি কুরআন এবং সুন্নাহ শোনা ও বোঝার ব্যবস্থা করে দেয়।

উপরন্তু কুরআন শুধুমাত্র এর অর্থগত অনুবাদের নাম নয়। বরং এটি প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা শব্দের অর্থের সমষ্টি হিসেবে বিবেচ্য। এর অর্থ হলো, একটি অনুবাদ কুরআনের আসল অর্থের যতই কাছাকাছি হোকনা কেনো, সেটি কখনোই কুরআনের সমতুল্য হবে না যা হচ্ছে মহাজাগতিক এবং আল্লাহর অসৃষ্ট বাণী। একটি অনুবাদ সর্বোচ্চ যা হতে পারে তা হলো অনুমান। অর্থাৎ মানুষ কুরআনের অর্থ সম্পর্কে যতটুকু অনুমান করতে পারে। এই অনুমানও হচ্ছে সীমাবদ্ধ যা কখনোই মহান আল্লাহর অসীম বাণীর পরিপূরক হতে পারেনা। আল্লাহর এই আয়াতকে একটু বিবেচনা করে দেখুন। আল্লাহ বলেন, “বলুন(হে মুহাম্মাদ(সাঃ)),যদি সমুদ্রগুলো কালি হতো আপনার রবের বাণী লেখার উদ্দেশ্যে তবে তা ফুরিয়ে যেত আপনার রবের বাণী লিখে শেষ করার পূর্বেই। যদিও এর সাথে আরো সমুদ্র যোগ করা হয়।” আল্লাহ আরো বলেন, “যদি পৃথিবীর গাছগুলো কলম হতো এবং সমুদ্রগুলো(কালি হতো), এবং আরো সাত সমুদ্র এর সাথে যোগ করা হতো তবুও আল্লাহর বাণী লিখে শেষ হবেনা। নিশ্চই আল্লাহ সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী।“ উপরন্তু অনুবাদের উপরে নির্ভরশীল হওয়ার (যা নিজেই ত্রুটিপূর্ন কারণ মানুষ তার অনুমান অনুযায়ী অনুবাদ করছে) অর্থ হলো একজন ব্যক্তি সর্বদাই কুরআনের সত্যিকারের প্রভাব, ঐশর্য এবং অনবদ্য মাধুর্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কুরআনের নিছক অনুবাদ মানুষের চোখকে অশ্রুসিক্ত করে না। বরং অন্তরে কাপুনি জাগানো শব্দগুলো এবং অর্থের পরিপূর্ণ মাধুর্য মানুষের চোখে অশ্রু বয়ে আনে।

৮। অনুবাদসমূহের সমস্যাগত দিক বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে যৌক্তিক কারণেই মুসলিমদের আরবি শিখা উচিত। আমাদের ইসলামী ঐতিহ্যের বেশিরভাগই অনারব মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে সহজলভ্য নয়। উপরন্তু অনুবাদগুলোর ত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা তো আছেই। তা নিম্নমানের অনুবাদ থেকে শুরু করে ভুল ব্যাখ্যা পর্যন্ত  হয়ে থাকে।

৯। ভাষা যেহেতু সংস্কৃতির প্রবেশদ্বার সেহেতু এর অনবদ্য প্রভাব রয়েছে এর ব্যবহারকারীদের উপর। ঠিক তেমনি আরবি যেহেতু ইসলামী সংস্কৃতির প্রবেশদ্বার সেহেতু এরও কিছু ইসলামী প্রভাব রয়েছে এর ব্যবহারকারীদের উপর। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে কুরআন এবং সুন্নাহ আরবি ভাষার উপর গভীর এবং সুদূরপ্রসারী দাগ কেটে গেছে। তাইতো আরবির মৌলিক বিষয়বস্তু ১৪০০ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।

১০। কিছু কিছু প্রাচ্য ভাষাবিদ ইসলাম এবং মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষবশত আরবি ভাষা শিখেছে যাতে তারা  ইসলামকে ধ্বংস করতে পারে এবং মুসলিমদের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারে। তাহলে মুসলিমরা কেন তাদের ইমান এবং ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় চেতনাদীপ্ত হয়ে ইসলামকে সমস্ত অনৈসলামিক শক্তি এবং ইসলামের শত্রুদের থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে আরবি চর্চা করেনা?

মতামত

comments

IIRT Arabic Intensive - একটি দুই বছর মেয়াদী অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা প্রোগ্রাম।

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

One Comment, RSS

  • Md. Atikul Islam Shah

    says on:
    September 25, 2018 at 3:45 am

    Really, to learn for the Arabic language should mandatory for every Muslims. Because of ALLAH and the last messenger (SM.) language was Arabic. Our eternal language will be Arabic. So we should love Arabic.

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*